Sunday, 26 April 2020

ভাতঘুম

সময় এখন বিকেল সাড়ে চারটে। শুনলেই মনে হয়, আহা এই তো ভাতঘুম দেওয়ার উপযুক্ত সময়। সত্যিই তাই! তার মধ্যে আজ আবার রবিবার, তা হলে তো আর কথাই নেই। পরম সুখ মনে হয় একেই বলে।

এই উপরের ভাবনাটা আমাদের এক মাস আগে পর্যন্তও কার্যকর ছিল।  কিন্তু হঠাৎ যেন কেমন সব পাল্টে গেছে।  আজ প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে আমার প্রিয় শহর যেন ঘুমাচ্ছে। ঘুমাচ্ছে গোটা রাজ্য, গোটা দেশ। করোনা মহামারীর প্রকোপে গোটা বিশ্বই যেন ঘুম দিচ্ছে , ঘুমোতে বাধ্য হয়েছে যেন।

রাস্তা শুনশান, গাড়িঘোড়া হীন ভাবে পড়ে আছে। নেই কোনো জনমানুষ, নেই কোনো কোলাহল। চারিদিকে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যদি একবার বারান্দা বা ছাদে গিয়ে দাঁড়াও তাহলে শুনতে পাবে অনেক অপরিচিত পাখির ডাক, যা অন্য সময় আমরা চাইলেও শুনতে পাই না। সকাল হয়, তার পর বেলা পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলেও চিত্রটা ঠিক পাল্টায় না। দেখে মনে হয় আমার শহরই যেন ভাতঘুম দিচ্ছে। তাও আবার শুধু দুপুরেই নয়, সারা দিন, সারা রাত।

বাড়িতে সময় কাটাতে কাটাতে যখন মাঝে মাঝে দূরদর্শন, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের পর্দায় চোখ রাখি, তখন কল্লোলিনীর খালি রাস্তাগুলো দেখে বুকটা যেন কেমন খাঁ খাঁ  করে ওঠে। আরে, এই তো গড়িয়াহাটের মোড়, এই তো শিয়ালদাহ স্টেশন, এই তো সেক্টর ফাইভের সেই ভিড়ে মাখা রাস্তাগুলো। কিন্তু একটাই প্রশ্ন - সেই ভিড়টা কোথায় হারিয়ে গেলো। আমার চেনা, আমার প্রিয় শহরটা তো এতো প্রাণহীন ছিল না।

জানি না কবে পুরোপুরি লোকডাউন উঠবে। উঠলেও ঠিক কিভাবে উঠবে। ওঠার পরও সব স্বাভাবিক হতে ঠিক কতটা সময় লাগবে। বা সব আদৌ স্বাভাবিক হবে তো ? করোনা ভাইরাস যেই রূপটা নিয়ে আমাদের সামনে পদার্পন করেছে, তাতে বিশ্বের গন্যমান্য বহু বিশিষ্ট্য বৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক বিশেষজ্ঞরা কিন্তু অন্য কথাই বলছেন। আমাদের চেনা পরিচিতি জীবন কিন্তু এই কোভিড-১৯ - এর ফলে আমূল ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। বেশি জমায়েত হয়তো করা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও তারা বলেছেন মানুষকে ঘরকুনো হতে শিখতে হবে। দরকার ছাড়া বেরোনোর ওপর লাগাম আনা হবে। এছাড়া আরেকটা জিনিস যেটা হয়তো অনেক দূর বদলে যাবে তা হল বিদেশ ভ্রমণ। মানুষের কাছে গোটা পৃথিবীটাই যেমন হাতের মুঠোয় ছিল, পরবর্তী কালে তা নাও থাকতে পারে। এই হল প্রাথমিক কতগুলি দিক, যেগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে।  পরে এই তালিকাটা আরও বাড়তেই পারে। খুবই ভাবার বিষয়!

এই পরিস্থিতিতে একজন মানুষ এবং কলকাতার একজন দায়িত্ত্বশীল নাগরিক হয়ে একটা প্রার্থনাই করতে পারি -

"কাটুক এই দুর্যোগের সময়, কাটুক এই মেঘলা দিন। আবার উঠুক রোদ, শুরু হোক জীবন দৈনন্দিন। 
আমার শহর উঠুক জেগে, ভাতঘুমের শেষে, সাথে জাগুক আমার রাজ্য, আমার দেশ আর গোটা বিশ্ব।"

লেখাটা প্রায় শেষ। জানালার বাইরে একবার চোখটা গেলো। দেখলাম সূর্য্য অস্ত যাওয়ার আগে, মেঘের আড়াল থেকে একবার রোদের ঝলকানি দিচ্ছে। আহা, একেই কি আশার আলো বলে!

No comments:

Post a Comment